১৯ জুন, ২০২৬

হে আমার সমস্ত পথের শেষ আলো,

আজ কর্মব্যস্ত দিনের শেষে

যখন জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম,

তখন দূরের আকাশটা

অদ্ভুত রকমের অপরিচিত মনে হলো।

এই শহরের রাস্তা, এই বাতাস, এই সন্ধ্যা—সবকিছুই আমার চারপাশে আছে,

অথচ কোথাও যেন একটি শূন্যতা থেকে যায়।

তারপর হঠাৎ উপলব্ধি করলাম,

শূন্যতাটা কোনো স্থান বা দৃশ্যের নয়;

শূন্যতাটা তোমার অনুপস্থিতির।

মানুষের জীবনে কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে,

যাদের গুরুত্ব বোঝার জন্য

আলাদা কোনো ঘটনার প্রয়োজন হয় না।

তারা নীরবে জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে, একসময় তাদের ছাড়া

নিজের দিনগুলোকেই অসম্পূর্ণ মনে হয়।

তুমি আমার কাছে ঠিক তেমনই।

তোমাকে ভাবার জন্য কোনো বিশেষ মুহূর্ত লাগে না; বরং এমন কোনো মুহূর্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন,

যেখানে তোমার কথা মনে পড়ে না।

আজ দুপুরে একটি পুরোনো বইয়ের পাতা

উল্টাতে গিয়ে দেখলাম,

বছরের পর বছর ধরে ভাঁজের মধ্যে চাপা পড়ে থাকা একটি শুকনো পাতা এখনো তার আকৃতি ধরে রেখেছে। তখন মনে হলো,

কিছু জিনিস সময়ের কাছে হার মানে না।

দূরত্ব তাদের ফিকে করতে পারে না।

ভালোবাসাও বোধহয় তেমনই।

যতদিনই কেটে যাক,

যত পথই মাঝখানে এসে দাঁড়াক,

হৃদয়ের সত্যিকারের টান তার নিজস্ব দীপ্তি হারায় না।

এখন রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে।

পৃথিবীর অসংখ্য জানালায়

একে একে আলো নিভে যাচ্ছে।

কিন্তু আমার ভেতরে একটি প্রদীপ এখনো জ্বলছে।

সেই প্রদীপের নাম—প্রতীক্ষা।

কোনো অস্থির প্রতীক্ষা নয়,

কোনো অভিযোগে ভরা প্রতীক্ষা নয়;

বরং এমন এক প্রশান্ত প্রতীক্ষা,

যে জানে তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটি তার জীবনেরই অংশ, শুধু আপাতত কিছু পথের ব্যবধান আছে।

আজকের দিনটিও তার সমস্ত ব্যস্ততা, ক্লান্তি, আলো আর ছায়া নিয়ে ইতিহাসের ভাঁজে গিয়ে জমা হলো।

আর আমি নীরবে ভাবলাম—কত আশ্চর্য!

পৃথিবী মনে করে আরেকটি দিন চলে গেল,

অথচ আমার কাছে মনে হয় আরেকটি দিন এসে

তার দায়িত্ব শেষ করে গেল।

সে আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সময়ের দেয়াল থেকে আরেকটি ইট খুলে নিয়ে চলে গেল।

তাই আজ কোনো দীর্ঘশ্বাস নয়,

কোনো আক্ষেপ নয়।

শুধু একটি নীরব হাসি।

কারণ আমি জানি—

প্রতিটি ফুরিয়ে যাওয়া দিন আসলে হারিয়ে যায় না;

সে তোমার কাছে ফেরার পথটুকু

আরেকটু ছোট করে দিয়ে যায়।

ইতি, তোমার অনুপস্থিতিতেও তোমাকেই নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষটি।
হুমায়ন আহমেদ